বিশ্বজুড়ে মন্দা, তবুও উড়ান: ভারতের ক্ষুদ্র উদ্যোগে রপ্তানিতে ২০% চমকপ্রদ বৃদ্ধি

MSME

Aroalo বিজনেস ডেস্ক
প্রকাশিত: aroalo.in | অর্থনীতি | ২৩ জুন, ২০২৫

নয়াদিল্লি:
যখন গোটা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় ধুঁকছে, তখন ভারতের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) খাত দেখিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রপ্তানিতে এই খাত ২০% বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের মন্থর গতির প্রেক্ষাপটে এক বড় মাইলফলক।

এই অর্জনের মাধ্যমে ভারতের এমএসএমই খাত প্রমাণ করল যে তারা কেবল টিকে নেই, বরং সাফল্যের নতুন অধ্যায় লিখছে। বর্তমানে তারা দেশের অর্থনীতির এক নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।


📈 সংকটের মধ্যেও সাফল্য

বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় এমএসএমই খাত ২০২৪-২৫ সালে মোট রপ্তানিতে ১৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রেখেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২০% বেশি।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে মাত্র ১.৭% বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, তখন ভারতের এমএসএমই খাতের এই পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ডঃ বিবেক রাও বলেন, “এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সংকটকেও সুযোগে পরিণত করার দক্ষতা ভারতের ছোট উদ্যোগগুলির রয়েছে।”


🔧 এই সাফল্যের মূল কারণ কী?

এই অপ্রত্যাশিত রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চালক কাজ করেছে:

  • ডিজিটাল রূপান্তর: অনেক এমএসএমই এখন অনলাইন মার্কেটপ্লেস, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে।

  • সরকারি প্রণোদনা: RoDTEP, PLI স্কিম এবং CGTMSE-এর অধীনে সহজ ঋণ ব্যবস্থার ফলে অনেক উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছেন।

  • নতুন বাজারে প্রবেশ: ইউরোপ বা আমেরিকার পাশাপাশি এখন এমএসএমই-রা ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।

  • উদ্ভাবনী পণ্য: পরিবেশবান্ধব কাপড়, আয়ুর্বেদিক পণ্য, এবং নিখুঁত যন্ত্রাংশের মতো পণ্য বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে।


🧵 কোন খাত সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে?

যদিও প্রায় সব খাতেই রপ্তানি বৃদ্ধি দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে:

  • বস্ত্র ও পোশাক: টেকসই ফ্যাব্রিকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তামিলনাড়ু, গুজরাট এবং পাঞ্জাবের পোশাক শিল্প ২৫% পর্যন্ত রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • যন্ত্রাংশ শিল্প: মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের অটো কম্পোনেন্ট নির্মাতারা ৩০%-এর বেশি রপ্তানি বৃদ্ধি দেখিয়েছে।

  • কৃষিভিত্তিক পণ্য: অর্গানিক মসলা, প্রসেসড ফুড ও হার্বাল চা-র আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়েছে।

  • হস্তশিল্প ও হোম ডেকর: রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে হস্তশিল্প পণ্যের রপ্তানি আবার চাঙ্গা হয়েছে।


🌐 স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক

এই এমএসএমই-রা একদিকে যেমন বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করছে, তেমনি ভারতের গ্রামীণ ও অর্ধ-নগর অঞ্চলকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করছে। এরা এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং লজিস্টিক পার্টনারদের সাহায্যে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারছে।

সুরতের খাদি পণ্যের উদ্যোক্তা মীরা পটেল বলেন, “আগে আমার গ্রাহক ছিল শুধু দিল্লি-এনসিআর। এখন আমার ৬০% অর্ডার আসছে অস্ট্রেলিয়া আর কানাডা থেকে।”

ডেলিভারি, শিপরকেট, এবং আমাজন গ্লোবাল সেলিং-এর মতো স্টার্টআপগুলিও ছোট ব্যবসায়ীদের রপ্তানির পথে সাহায্য করেছে।


🗣️ সরকারের প্রতিক্রিয়া

কেন্দ্রীয় এমএসএমই মন্ত্রী নারায়ণ রানে উদ্যোগপতিদের “দূরদর্শী সাফল্য”র জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং জানান, সরকার আরও সহায়ক নীতির পথে হাঁটছে।

তিনি কয়েকটি নতুন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন:

  • টিয়ার-২ ও ৩ শহরে Export Facilitation Centre সম্প্রসারণ

  • বিশেষ ট্রেড ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট প্রদান

  • ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক্সপোর্ট ডকুমেন্টেশন সহজীকরণ


⚠️ চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে

সবকিছু সত্ত্বেও কিছু বড় সমস্যাও রয়ে গেছে:

  • ঋণের অপ্রতুলতা: বহু ছোট ব্যবসা এখনো বড় ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় জামানত দিতে পারে না।

  • বৈদেশিক নিয়মনীতি: বিদেশি বাণিজ্য আইন, প্যাকেজিং স্ট্যান্ডার্ড, ট্যাক্স সুবিধা বোঝা জটিল।

  • অবকাঠামো দুর্বলতা: অনেক অঞ্চলেই এখনও বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং বন্দর পরিকাঠামো অপ্রতুল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আরও কাঠামোগত সংস্কার এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন।


🔮 সামনে কী আছে?

বিশ্বের অনেক ক্রেতা এখন চিন বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তে ভারতকেই বিকল্প হিসাবে দেখছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে সরকার Global MSME Expansion Policy আনার পরিকল্পনা করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, বিদেশে গুদাম ভাড়া ও ডিজিটাল মার্কেটিং-এর জন্য অনুদান দেওয়া হবে।

ভারতের ২০৩০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যে এমএসএমই খাত এখন মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে চলেছে।


✅ উপসংহার

ভারতের এমএসএমই-রা আকারে ছোট হতে পারে, কিন্তু তাদের সাহস, উদ্ভাবন এবং দৃঢ়তার কোন তুলনা নেই। বিশ্ব যখন ধীরে চলছে, তখন ভারতের এই ছোট উদ্যোগগুলি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়।