বিদেশে পড়েও দেশেই স্বীকৃতি: ইউজিসি-র নতুন ক্রেডিট ট্রান্সফার পোর্টাল বদলাবে শিক্ষার মানচিত্র

Aroalo সংবাদ ডেস্ক থেকে
প্রকাশিত: aroalo.in | শিক্ষা | ২৩ জুন, ২০২৫

নয়াদিল্লি:
বিদেশে পড়তে যাওয়া লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শিক্ষার্থীর জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)। সম্প্রতি চালু হওয়া “Academic Bank of Credits – আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ট্রান্সফার পোর্টাল” শিক্ষার্থীদের বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত একাডেমিক ক্রেডিট গুলিকে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্থানান্তরের সুযোগ দিচ্ছে।

এই নতুন ডিজিটাল উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি একাডেমিক সেতু গড়ে তুলেছে, যা দেশের বাইরে পড়াশোনার অভিজ্ঞতাকে ভারতের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দিচ্ছে।


আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা পেল ভরসা

বিদেশে পড়া শেষ না করে দেশে ফিরে আসা বহু শিক্ষার্থীকে তাদের পূর্ববর্তী পড়াশোনার স্বীকৃতি না পাওয়ায় আবার নতুন করে কোর্স শুরু করতে হয়েছে। ইউজিসি-র এই নতুন পোর্টাল সেই সমস্যা দূর করে শিক্ষার্থীদের ইতিপূর্বে অর্জিত জ্ঞান ও পড়াশোনাকে মূল্য দেবে।

UGC-র চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জগদেশ কুমার বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ করলেও ভারতের সঙ্গে তাদের একাডেমিক সম্পর্ক অটুট থাকুক। এই পোর্টাল সেই লক্ষ্যেই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।”


কীভাবে কাজ করবে পোর্টাল?

এই পোর্টালের মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীরা অনলাইনে নিজেদের একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট আপলোড করতে পারবেন। সেই অনুযায়ী ইউজিসি তাদের অর্জিত ক্রেডিট ভারতীয় সমমানের কোর্সের সঙ্গে তুলনা করে যাচাই করবে।

যাচাইয়ের পরে সেই ক্রেডিট Academic Bank of Credits (ABC) অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে। যেকোনো অংশগ্রহণকারী ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেই ক্রেডিট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে।

কাজের ধাপগুলি:

  • শিক্ষার্থী তাদের আন্তর্জাতিক ট্রান্সক্রিপ্ট আপলোড করবেন

  • ইউজিসি তা যাচাই করে ভারতীয় কোর্সের সঙ্গে তুলনা করবে

  • স্বীকৃত হলে ক্রেডিট ABC অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে

  • ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেই ক্রেডিট গ্রহণ করবে

এই পদ্ধতিতে ডিগিলকার এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।


শিক্ষার্থীদের জন্য সুসংবাদ

এই উদ্যোগ শুধুমাত্র ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং যারা যৌথ ডিগ্রি বা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যুক্ত, তাদের জন্যও লাভজনক। এমনকি আন্তর্জাতিক অনলাইন কোর্স বা MOOC প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্জিত ক্রেডিটও স্থানান্তরযোগ্য হতে পারে, যদি তা ইউজিসি অনুমোদিত হয়।

প্রাথমিকভাবে, QS বা THE-র শীর্ষ ১০০০ র‍্যাঙ্কে থাকা বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকেই ক্রেডিট স্থানান্তর অনুমোদিত হবে। একইসঙ্গে, ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিরও NAAC বা NIRF মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।


শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

বহু শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

আঞ্জলি মেহতা, যিনি কোভিডের সময় ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন, বলেন, “আমার বিদেশি ডিগ্রির কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। এক বছরের ক্ষতি হয়েছে। এই পোর্টাল থাকলে আমি অনেকটা এগিয়ে থাকতাম।”

LinkedIn এবং X-এ এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার ও বিদেশে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে।


চ্যালেঞ্জও আছে

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সমন্বয় এবং একটি নিয়মিত আপডেট হওয়া মানচিত্র-ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।

“বিদেশি কোর্সের গুণমান ও ভারতীয় পাঠ্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে সমস্যা হতে পারে,” বললেন অধ্যাপক রাজীব সিনহা, জেএনইউ-এর শিক্ষা বিশ্লেষক। এই সমস্যা মোকাবেলায় ইউজিসি AI-ভিত্তিক ক্রেডিট মানচিত্র তৈরি ও একটি বিশেষ যাচাইকরণ কমিটি গঠন করতে চলেছে।


সামনে কী?

এই পোর্টাল শুধু একাডেমিক সমন্বয়ের মাধ্যম নয়, বরং একটি বৃহৎ শিক্ষানীতির অঙ্গ। এর মাধ্যমে ভারত এমন এক আন্তর্জাতিক শিক্ষার নকশা তৈরির পথে হাঁটছে, যেখানে সীমান্ত নয়, দক্ষতা ও গুণমানই শেষ কথা।

আগামী দিনে ইউজিসি একাধিক ওয়েবিনার, গাইডলাইন বুক এবং হেল্পডেস্ক চালু করবে এই ব্যবস্থার প্রচার ও সাহায্যের জন্য। থাকছে একটি AI-চালিত সহায়ক চ্যাটবট “শিক্ষামিত্র”।


উপসংহার

বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষা আর কোনও একটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউজিসি-র এই আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ট্রান্সফার পোর্টাল শিক্ষাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা—যেখানে শিক্ষার্থী চাইলেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পড়ে ভারতেই ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে পারবেন। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং শিক্ষায় স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠার পথে এক সাহসী পদক্ষেপ।