aroalo.in

গ্রামের স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তে ঝড় উঠেছে উত্তরপ্রদেশে: শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে কি গ্রামের শিশুরা?

A rural Indian girl in a school uniform

A rural Indian girl in a school uniform

২১ জুন ২০২৫ | লখনউ | লিখেছেন: aroalo.in নিউজ ডেস্ক

উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে শুরু হয়েছে এক নয়া বিতর্ক। রাজ্য সরকার ‘দক্ষতা বৃদ্ধির’ অজুহাতে যে পরিকল্পনায় ছোট ছোট সরকারী স্কুল বন্ধ করে বড় স্কুলে সংযুক্ত করতে চাইছে, তা এখন প্রবল সমালোচনার মুখে। অনেকেই বলছেন—এই পদক্ষেপ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের থেকে শিক্ষাকে আরও দূরে ঠেলে দেবে।

এই নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। তাঁর অভিযোগ, এই স্কুল সংযুক্তকরণ প্রকল্প গরিব ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। তিনি আরও বলেন, রাজ্যে বর্তমানে ২ লাখের বেশি শিক্ষকপদ খালি রয়েছে, আর তার পরিবর্তে সরকার স্কুল কমিয়ে চলেছে!


কী রয়েছে এই নীতিতে?

রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ-প্রাথমিক স্কুলে ৩০ জনের কম ছাত্র রয়েছে, সেগুলি বন্ধ করে কাছের বড় স্কুলে সংযুক্ত করা হবে। এর ফলে শিক্ষক নিয়োগে কার্যকারিতা বাড়বে ও পরিকাঠামো উন্নত হবে—এমনটাই দাবি শিক্ষা দপ্তরের।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে যেখানে বাস ও নিরাপত্তার সুবিধা সীমিত, সেখানে প্রতিদিন ২–৫ কিমি হেঁটে স্কুল যাওয়া শুধু কষ্টকরই নয়, অনেক শিশুর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।


মাঠ থেকে উঠে আসা কণ্ঠস্বর

বাঁদা জেলার এক গ্রাম স্কুলের সামনে ১২ বছরের রাধা দেবী বলল, “আমার স্কুল যদি চলে যায়, আমি আর যেতে পারব না।” তাঁর মা বললেন, “নতুন স্কুল ৪ কিমি দূরে। আমরা তো ওকে একা পাঠাতে পারি না!”

এই কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল বিভিন্ন জেলা ঘুরে। বাবা-মায়েরা আশঙ্কা করছেন—স্থানীয় স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের সন্তানরাই শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়বে।


অখিলেশ যাদবের তীব্র সমালোচনা

এই সিদ্ধান্তকে “গরিব বিরোধী” এবং “সংরক্ষণ বিরোধী” আখ্যা দিয়ে অখিলেশ যাদব বলেন, “সরকার শিক্ষক নিয়োগ না করে স্কুল বন্ধ করছে। এতে কেবল পিছিয়ে পড়া শ্রেণির ক্ষতি হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “এই স্কুলগুলির অধিকাংশই তফসিলি জাতি, উপজাতি ও ওবিসি সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্য। এগুলি বন্ধ হলে সংরক্ষণের সুযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”


নীতি বিশ্লেষকদের মতামত

শিক্ষা নীতিবিদদের মতে, স্কুল সংযুক্তিকরণ কোনও নতুন ধারণা নয়, তবে কার্যকর করতে হলে পরিবহন, নিরাপত্তা ও স্থানীয় বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা সংস্থার প্রফেসর রেখা সিং বলেন, “যানবাহন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার সমাধান ছাড়া স্কুল বন্ধ করলে তা শিক্ষারই ক্ষতি করবে।”


শিক্ষকের ঘাটতি—এক গভীর সংকট

উত্তরপ্রদেশে প্রাথমিক স্তরে ২ লক্ষাধিক শিক্ষক পদ ফাঁকা। কিন্তু এই সংকট মেটানোর বদলে সরকার এখন যেটুকু শিক্ষক আছেন তাঁদের দিয়েই সব কাজ চালাতে চাইছে।

আজমগড় জেলার শিক্ষিকা নীলম কুমারী বলেন, “আমরা একা একা ৫-৬টি ক্লাস সামলাচ্ছি। এখন আবার বেশি ছাত্র দিয়ে কম শিক্ষক চালানো মানে শিক্ষার মান আরও নামবে।”


সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েরা

জাতীয় পরিসংখ্যান বলছে, মেয়ে শিশুরা স্কুল ছাড়ে প্রধানত নিরাপত্তা, দুরত্ব এবং শৌচাগারের অভাবে। যদি স্কুল আরও দূরে চলে যায়, তবে এই সমস্যা ভয়ঙ্কর আকার নিতে পারে।

সীতাপুর জেলার ‘কন্যা শিক্ষা অভিযান’ এনজিওর রিতু রাজ বলেন, “এত কষ্ট করে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো যাচ্ছে। এখন যদি স্কুলই দূরে চলে যায়, তাহলে তো তারা আবার ঘরেই থেকে যাবে।”


সমাধান কী হতে পারে?

এই বিতর্কের মধ্যে শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা কয়েকটি সমাধান প্রস্তাব করেছেন:

  1. স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে পদক্ষেপ
    প্রতিটি স্কুল বন্ধ করার আগে এলাকার ভৌগলিক ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে হবে।

  2. বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা
    শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকেল বা স্কুল বাস চালু করতে হবে।

  3. শিক্ষক নিয়োগে গতি আনা
    শিক্ষক শূন্যতা পূরণ করাটাই হওয়া উচিত সরকারের প্রথম কাজ।

  4. সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ
    স্থানীয় বাসিন্দাদের মত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।


শেষ কথা

উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই স্কুল সংযুক্তকরণ পরিকল্পনা শুধুই পরিকাঠামোর ব্যাপার নয়, এটি মানুষের উপর আস্থা ভঙ্গের প্রশ্ন। যখন গ্রামবাসীরা ভাবছেন যে সরকার তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত রাখবে, তখন স্কুল বন্ধ করে দেওয়া সেই আস্থাকেই ধাক্কা দিচ্ছে।

শিক্ষা কখনই খরচ কমানোর নীতি হতে পারে না—বরং তা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

Exit mobile version