আরো আলো প্রতিবেদন | ২২ জুন, ২০২৫
বর্ষার কুয়াশা যখন উত্তর ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে সবুজ চাদর বিছিয়ে দেয়, তখন হাজার হাজার পর্যটক শহরের গরম ও কোলাহল থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন পাহাড়ে। মানালি, মুসৌরি, দার্জিলিং, শিমলা ও নাইনিতাল-এ জুন মাসে দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব পর্যটন ভিড়, যা সাধারণত বর্ষাকালে দেখা যায় না।
যেখানে আগে এই সময়টাকে “অফ-সিজন” হিসেবে ধরা হতো, এবার সেখানে শুরু হয়েছে ‘বর্ষা মাইগ্রেশন’—মানুষ কাদা, ধস ও ট্র্যাফিক উপেক্ষা করেই ছুটছেন পাহাড়ের শান্তিতে।
🏞️ পরীক্ষা শেষে ছুটি আর সোশ্যাল মিডিয়ার তাড়া
ট্যুর অপারেটর ও হোটেল মালিকরা জানাচ্ছেন, এই ভিড়ের মূল কারণ দুটি—স্কুল-কলেজের পরীক্ষা শেষ হওয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় “ভিউ-যোগ্য” লোকেশন খোঁজা।
মানালির একটি রিসর্টের মালিক রবী মেহতা বলেন,
“আগে জুন মাসে বৃষ্টি হলে বুকিং বাতিল হতো। এবার পুরো বুকড। পরিবার, কাপল, ইনফ্লুয়েন্সার—সবাই এসেছে।”
একটি রিল যেখানে মুসৌরির কুয়াশাময় ক্যামেল ব্যাক রোড দেখানো হয়েছে, সেটি মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এরপর থেকেই বুকিং বাড়তে শুরু করে।
🚗 স্বর্গে যানজটের বিভীষিকা
এই পর্যটন-তাণ্ডবের পরিণতি সুস্পষ্ট।
শিমলার রাস্তায়, যা এখনও ব্রিটিশ আমলের সরু গলিপথে সীমাবদ্ধ, গত সপ্তাহে ৩ কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন দেখা যায়। দার্জিলিংয়ে যানবাহনের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৪০% বেড়েছে।
প্রশাসন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করলেও পরিকাঠামোর দুর্বলতা ভাঙতে পারেনি।
পরিবেশকর্মী কবিতা জোশী বলেন,
“পর্যটন অর্থনীতির জন্য ভালো, কিন্তু নাগরিক পরিকাঠামো ধ্বংসের বিনিময়ে নয়।”
🏨 চড়া হোটেল ভাড়া, নোংরা চারপাশ
হোটেল ভাড়াও দুইগুণ বেড়েছে, আর সঙ্গে বেড়েছে আবর্জনা। নাইনিতালে লেকের ধারে ও বাজার এলাকায় প্লাস্টিক ও জঞ্জালের স্তূপ দেখা যাচ্ছে।
মুসৌরিতে মাত্র দুই দিনে ১২ হাজার প্লাস্টিক বোতল সংগ্রহ করেছে সাফাইকর্মীরা। হোটেলগুলো অতিথিদের বলছে—“কম তোয়ালে ব্যবহার করুন”, “শর্ট শাওয়ার নিন”—কারণ জলাভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
🌿 সবুজ আন্দোলন: পর্যটকদের সচেতন করা যাবে কি?
কিছু হিল স্টেশন প্রশাসন সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
– হিন্দি-ইংরেজি-স্থানীয় ভাষায় বোর্ড
– হোটেলে পরিবেশ বিষয়ক শর্ট ভিডিও
– কাপড়ের ব্যাগ বিতরণ
– দার্জিলিংয়ে QR কোড ভিত্তিক ইকো-পাস চালু হয়েছে
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—পর্যটকরা কতটা সচেতন হবেন?
“প্রকৃতিকে আপনি থামাতে পারবেন না, কিন্তু নিজের আচরণ আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন,” — মানালির এক চায়ের দোকানদারের মন্তব্য।
📉 টেকসই পর্যটন না মৌসুমি বিপর্যয়?
এই বছরের বর্ষাকালীন পর্যটনের উত্থান হয়তো এক নতুন ট্রেন্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটনের ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে।
পর্যটন কনসালটেন্ট প্রিয়াঙ্কা দত্তা বলেন,
“আমরা হয় স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিই, নয়তো ধীরে ধীরে সব ভেঙে পড়বে। পাহাড় আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে—এবার আমাদের পালা প্রকৃতিকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার।”