মাতৃর শক্তি: কামাখ্যার নিগূঢ় সাধনায় আবার ফিরল অম্বুবাচী মেলা

Ambubachi Mela

২১ জুন ২০২৫ | গুয়াহাটি | আরো আলো সংস্কৃতি ডেস্ক

নীলাচল পর্বতের উপরে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কুয়াশায় ভেসে থাকা সেই প্রাচীন মন্দিরটিতে আবারও ফিরে এসেছে অম্বুবাচী মেলা। প্রতি বছরের মতো এবারও ২২ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত, কামাখ্যা দেবীর পবিত্র ঋতুকাল উপলক্ষে মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকবে—তিনদিন ধরে।

এই সময়টিকে দেবীর ঋতুব্রতের সময় হিসেবে মানা হয়। মন্দির বন্ধ থাকা এই সময়টিতে মায়ের বিশ্রামের প্রতীক হিসেবে কোনো পুজো বা দর্শন হয় না। আর ২৬ জুন ‘প্রবৃত্তি তিথি’তে, মন্দিরের পুনরায় দ্বারোদ্ঘাটনের মাধ্যমে শুরু হয় দেবী দর্শনের মহাযজ্ঞ।

তবে অম্বুবাচী মেলা শুধুই কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি হল নারীত্বের শক্তি, সৃজনশীলতা ও ঋতুর সম্মান জানানো এক বর্ণাঢ্য সাধনাযাত্রা, যা ভারতের অন্য কোনো উৎসবের সঙ্গে তুলনীয় নয়।


নারীর ঋতুকে পবিত্র বলে মেনে চলা একমাত্র উৎসব

অসমের কামাখ্যা মন্দির হল ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম। কথিত আছে, এখানে দেবী সতীর গর্ভযোনি পতিত হয়েছিল। তাই এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই—পূজিত হয় একটি যোনির আকৃতির প্রাকৃতিক পাথর, যার ওপর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবাহিত হয় এক ঝর্ণাধারা।

এই পবিত্র পাথর এবং তার প্রাকৃতিক রক্তবর্ণ স্রোতকে ঘিরেই তিন দিন ধরে চলে ঋতুব্রত পালন—দেবী বিশ্রামে যান, আর মন্দিরের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়।


জনস্রোত, সাধনা ও সংস্কৃতির বিস্ফোরণ

গুয়াহাটি শহরের প্রশাসনের মতে, মেলাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ১.৫ লক্ষেরও বেশি তীর্থযাত্রী পৌঁছে গিয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাধু, তান্ত্রিক, আগরী, ভক্ত, পর্যটক ও গবেষকরা নীলাচল পাহাড়জুড়ে তাঁবু খাটিয়ে শুরু করেছেন তাঁদের সাধনাপর্ব।

ধূপ, বৃষ্টির গন্ধ ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। এই মেলায় বিশ্বাস, ভক্তি ও ব্যতিক্রমী আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার এক বিশাল মেলবন্ধন দেখা যায়।

অসম সরকার মোতায়েন করেছে স্বাস্থ্যকর্মী দল, মোবাইল চিকিৎসা ইউনিট, জল সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টিম। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ড্রোন নজরদারি ও উদ্ধার ব্যবস্থা


তন্ত্র ও ঋতু – নিষিদ্ধ থেকে পবিত্রের পথে

অম্বুবাচী মেলার সবচেয়ে অনন্য দিক হল এর তান্ত্রিক মূলভাবনা। এখানে রজঃস্বলা দেবীর উপাসনা হয়, যা সমাজে এখনও অনেকখানেই নিষিদ্ধ বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

এই উৎসবে মাসিক বা ঋতু লজ্জার বিষয় নয়, বরং শক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক

স্থানীয় গবেষক ডঃ অমিতা দাস বলেন:

“অম্বুবাচী সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এখানে রজঃস্বলা মানে অপবিত্র নয়—বরং সৃষ্টি ও জীবনের সূচনা। এটা নারীর শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ।”


অর্থনীতি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন

এই মেলাকে ঘিরে গুয়াহাটির অর্থনীতি কয়েকগুণ গতি পায়। হোটেল, যানবাহন, খাবারের দোকান, ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রেতা—সবখানেই চাহিদা বাড়ে।

একই সঙ্গে এটি বহু সাধকের জন্য আত্মানুসন্ধানের সময়। বিশ্বাস করা হয়, অম্বুবাচীর সময় সাধকরা বিশেষ সিদ্ধিলাভে সক্ষম হন।


বিশ্বের দৃষ্টি, স্থানীয়ের অভিমান

বর্তমানে অম্বুবাচী মেলা বিদেশি গবেষক ও পর্যটকদের কাছেও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তবে স্থানীয়রা এখনও একে অতি পবিত্র রীতি হিসেবেই দেখেন।

মন্দির ট্রাস্টের সদস্য নিলিমা বড়োলৈ বলেন:

“এটা কোনও ট্যুরিস্ট ফেস্টিভাল নয়। এটা আমাদের দেবী, আমাদের মাটি ও আমাদের আত্মার উৎসব।”


২০২৫-এর সচেতন উদ্যোগ

এ বছর অসম পর্যটন বিভাগ পরিবেশবান্ধবভাবে মেলা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন NGO-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
স্থাপন করা হয়েছে ইকো-টয়লেট, প্লাস্টিক-বর্জন ক্যাম্পেইন, ও মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা শিবির

তাছাড়াও মন্দির কর্তৃপক্ষ অনলাইন দর্শনলাইভ রিচুয়াল স্ট্রিমিং চালু করেছে, দূরের ভক্তদের জন্য।


উপসংহার: এক প্রাচীন শক্তির নবজাগরণ

অম্বুবাচী শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়—এটি এক চিরন্তন প্রাকৃতিক সত্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই সময় প্রকৃতিও বিশ্রাম নেয়, জমি উর্বর হয়, সৃষ্টি প্রস্তুতি নেয়।

রজঃস্বলা দেবী যেন আমাদের মনে করিয়ে দেন—
“তিনিও রক্তাক্ত হন, তাই বিশ্ব সৃষ্টি পায়।”